খুলনার ডুমুরিয়ায় প্রভাবশালীদের দখল ও ইজারার কবলে থাকা হাতিটানা নদী জনস্বার্থে উন্মুক্ত করার দাবিতে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নদীকেন্দ্রিক জীবিকা হারানো শত শত ভুক্তভোগী এলাকাবাসী এতে অংশ নিয়ে ..
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরখালি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহাসিক হাতিটানা নদীকে জনস্বার্থে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবিতে সন্ধ্যায় ব্রহ্মারবেড় বাজার চত্বরে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি সুভাষ সরকারের সভাপতিত্বে এবং ইউপি সদস্য মনোজ সরকারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাগুরখালি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরদার আব্দুস সালাম। মূলত চলতি বছরে একটি প্রভাবশালী মহলের নামে নদীটি ইজারা নেওয়ার পর থেকেই স্থানীয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং নদীভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নজিরবিহীন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, যার ফলে নদীপারের বঞ্চিত ও খেটে খাওয়া মানুষ বাধ্য হয়ে রাজপথে নেমে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়দের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সমাবেশে নদী দখলের নেপথ্য শক্তি এবং ইজারাদারদের একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়, যা সাংবাদিকতার কাঠামোর আলোকে বর্তমান জনদুর্ভোগের একটি স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
সমাবেশে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, নদীটি ইজারা নেওয়ার পর থেকেই বর্তমান দখলদার ও ইজারাদাররা দুই পাড়ের বসতি স্থাপনকারী সাধারণ মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত রুঢ় ও মারমুখী আচরণ অব্যাহত রেখেছেন। অতীতে এই অঞ্চলের মানুষ হাতিটানা নদীতে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মাছ শিকার, গবাদিপশুর গোসল করানো এবং গৃহস্থালির নানা দোয়াপালার কাজ করতে পারতেন, যা তাদের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু বর্তমান ইজারাদাররা নদীর ওপর পেশিশক্তি প্রয়োগ করে সাধারণ মানুষকে শুধু মাছ ধরতে বাধা দেওয়াই ক্ষান্ত হননি, বরং খালে নামার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন এবং প্রতিবাদ করলেই নানা ধরনের মিথ্যা মামলা ও হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ সনাতনী ও অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সদস্য হওয়ায় নদী থেকে মাছ ধরে তা বিক্রি করেই তাদের সংসার চালাতে হয়, অথচ বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জীবিকার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। নদীপারের শত শত নারী-পুরুষের সরাসরি অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সমাবেশে বক্তারা ইজারাদারদের এই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে স্থানীয় জনগণের চিরাচরিত অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
স্থানীয় এই গণসমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইউপি সদস্য সঞ্জয় সানা, ধর্মদাস মন্ডল, ভবেন্দ্রনাথ মন্ডল, মহাদেব সানা, গোপাল চন্দ্র হালদার, ডা. বিজন বিহারী সরকার, বিএনপি নেতা ঠাকুর দাস মন্ডল, ওয়ার্ড বিএনপি নেতা তারক চন্দ্র মন্ডল এবং গ্রামবাসী পঞ্চানন বৈদ্য প্রমুখ। বক্তারা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিরব ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন যে, একটি প্রাকৃতিক জলাশয় বা নদীকে এভাবে কুক্ষিগত করে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে এই অবৈধ ইজারা বাতিল করে নদীটি আগের মতো সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত না করলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেন তারা। এ সময় সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের নিকট অবিলম্বে হস্তক্ষেপ কামনা করে বক্তারা বলেন যে, নদীপারের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা রক্ষার স্বার্থে অবিলম্বে প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে এবং ইজারাদারদের সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রম ও দমনপীড়ন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
হাতিটানা নদীকে কেন্দ্র করে ডুমুরিয়ার মাগুরখালি ইউনিয়নে তৈরি হওয়া এই সামাজিক অসন্তোষের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পুরো অঞ্চলের আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক ছায়া ফেলছে। ঐতিহ্যবাহী একটি প্রাকৃতিক উৎস থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করার এই অপচেষ্টা কেবল তাদের মৌলিক অধিকারকেই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও জনবহুল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও তৈরি করছে। সময়মতো এই সংকটের সুষ্ঠু ও আইনি সমাধান করা না হলে নদী দখলকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মতো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই জনস্বার্থ রক্ষার্থে এবং গ্রামীণ জনসাধারণের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।




