বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে ছোট ছেলে শরাফত করিমের কিছু কথা

আমার আব্বার নাম লোকমান হোসেন মিন্টু উনি  ডিপ্রেশনের রোগী ছিলেন। সব সময় টেনশনে থাকতো।  সব সময় উনার  ওষুধ চলত।কিন্তু উনি খুব স্মার্ট লোক ছিলেন, উনার কথাবার্তা সবার থেকে আলাদা ছিলেন। উনি অসুস্থ হলে কখনো আমাকে বলতেন না, সব সময় আমাদেরকে বুঝাইতো যে উনার নরমাল রোগ  সেই ওষুধ আনত।
একদিন রাত আমি অনেক অসুস্থ বিছানা থেকে উঠতে পারতেছি না, ঐদিন আমার আব্বু আমাকে বলে দোকান খুলে আমার পা ব্যথার ওষুধ দিতে পারবি নাকি, এই কথা শুনে আমি অবাক কখনো আব্বা  আমাকে এভাবে ওষুধ আনতে বলে নাই, কিন্তু আমি এত অসুস্থ তারপরও  আমাকে বলতেছে, পরে আমি তাড়াতাড়ি দোকানে যাই ওষুধ আনে দেই।ওষুধ খেয়ে আমাকে বলতেছে মনে হয় পা একটা বন্ধ হয়ে  যাইতেছে। তখন আমি ভাবছি রাত যাক সকালে  হসপিটালে নিয়ে  নিয়ে যাব।
পরে দিন আমি দোকানে যাই দোকান থেকে ১২:০০ টার সময় বাড়িতে আসি, তখন আমি আম্মাকে বলতেছি আব্বারে এখন হসপিটালে নিয়ে যাব। তখন আম্মু বলতেছে আগে গোসল করুক। আমি বলছি ঠিক আছে গোসল করতে বলেন।তখন আম্মু ডাকতেছে উনি উঠতেছে না। তখন আমরা অনেকে ধরাধরি করি উনাকে বাইরে বাহির করছি গোসল করানোর জন্য। বাহির করার পরে দেখলাম উনি কথা বলতে পারতেছে না উনার মুখে পানি দিলে পানি খাইতে পারতেছে না চারদিকে সবার কান্নাকাটি শুরু হয়ে যায়। তখন আমি তাড়াতাড়ি একটা এম্বুলেন্সে এ করে উনাকে মাইজদি  রয়েল হসপিটালে নিয়ে যায়। তখন ডাক্তাররা সিটি স্ক্যান করার পর বলতেছে এটা কোন সমস্যা না উনার ব্রেনের রগ শুকিয়ে গেছে। তারা ভর্তি দিয়েছে, তখন আব্বা আস্তে আস্তে কথা বলতে পারতেছে, নাস্তা দিছি নাস্তা খাইতেছে, পরে হঠাৎ বলতেছে আমার শ্বাসকষ্ট হয়, ডাক্তার ওনাকে শ্বাসকষ্টের ওষুধ দেয় অক্সিজেন দেয়, একটু পর বলতেছে আমার দুই পা বন্ধ হয়ে গেছে লারাতে  পারতেছি না।
তখন মাইজদী ফাহিম  হসপিটালের ফারুক হোসেন ডাক্তারকে আব্বাকে  দেখার জন্য আনা হয়। উনি বলতেছে আপনার আব্বা Guillain-Barré Syndrome – GBS হয়েছে।আপনারা যত দ্রুত তাড়াতাড়ি সম্ভব উনাকে ঢাকা মেডিকেল হসপিটালে নিয়ে যান। তখন তো আমার মাথা পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা এই সময়ের মধ্যে আমি একা কি করব, তখন একটি এম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই।
তখন আব্বার শ্বাসকষ্ট আস্তে আস্তে অনেক বাড়তেছে কথা আর চোখ দুইটাই বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক জোরে জোরে  শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তখন আমার মোবাইলে কমপক্ষে ১০০০ লোকের ফোন আসে। কেউ বলতেছে ওই হসপিটালে নিয়ে যা কেউ বলতেছে এই হসপিটালে নিয়ে যা, এই সময় কি সিদ্ধান্ত নিব কিছুই বুঝতেছিনা, কার সিদ্ধান্তকে ভালো সিদ্ধান্ত মনে করব কিছুই বুঝতেছিনা, আমার আব্বার মৃত্যুর 70% কারণ আমি মনে করি আমার মোবাইলে হাজার হাজার ফোন যা আমাকে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে দেয় নাই।আমি চার বছর থেকে মানুষকে হসপিটালে নিয়ে ডাক্তার দেখাইছি, কিন্তু আমার আব্বাকে কোথায় দেখাবো সে সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি নাই,  পরে আমি কারো কথা না শুনে ঢাকা মেডিকেলে রওনা দিলাম তখন আমাদের বাড়ির হাবিব ভাইকে আমি ফোন দিয়ে বললাম ভাই আপনি কষ্ট করে ঢাকা মেডিকেলে আসেন। তখন আমার সাথে ছিল আমার মা আমার বোন জ্যাঠাতো  ভাই চাচাতো ভাই একজন আর শনিআকরা থেকে উঠে আত্মীয় একজন। তখন ঢাকা মেডিকেল ডুকানোর  পরে উনারা চেক করে বলছে, তাড়াতাড়ি উনার আই সি ইউ প্রয়োজন কিন্তু ঢাকা মেডিকেলের আই সি ইউ খালি নাই, তখন বাজে রাত ৩ টা। তখন ঢাকা মেডিকেলের আশেপাশে অনেক হসপিটালে ফোন দেওয়া হয়েছে আই সি ইউ খালি পাই নাই। তখন ধানমন্ডি ২৭ এ Spermax হসপিটালে নিয়ে যাই, তারা আব্বাকে আই সি ইউ  রুমে ঢুকায়, পাঁচ মিনিট পরে ওখান থেকে   বলতেছে রোগী মারা গেছে, তখন তো পুরা ঢাকা শহর কেঁপে উঠছে আমার সুস্থ বাবা কিভাবে মারা যায়।
যে বাবা সাথে কেউ জোর গলায় কথা বললে আমার তিন দিন ঘুম আসতো না,আজ সে বাবা নাকি আমার সামনে মারা গেছে। যে বাবা সামান্য একটু ব্যাথা পাইলে আমার বুক ফেটে যাইত, এখন নাকি উনি  মারা গেছে আমার সামনে।
আমার মা বোনের সামনে মারা গেছে, তখন আমার ভাই আমাকে অনেক বার ফোন দেয় আমি ধরিনা।।তখন ভাই এসএমএস দেয় আব্বা শেষ।আব্বাকে নিয়ে বাড়িতে আসতেছস কতটুক আইছত?তখন আমি কিছু বলুনাই। যে ছেলে বাবার ব্যাথা সহ্য করতে পারতোনা আজ সে তার বাবার লাশ নিয়ে বাড়িতে যাইতেছে।
সুস্থ বাবার মৃত্যু আমি কখনো মেনে নিতে পারি নাই,  আমার বিশ্বাস হইতেছে না যে আমার বাবা মারা গেছে।
পরে কি হইছে আমার আর কিছু মনে নাই।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top