ডুমুরিয়ায় মিকশিমিল রুদাঘরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি: অভিভাবক সমাবেশে কড়া নজরদারির তাগিদ

ডুমুরিয়ায় মিকশিমিল রুদাঘরা উচ্চ বিদ্যালয় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি রোধ ও পড়াশোনায় মনোযোগ ফেরাতে এক বিশেষ অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে সন্তানদের ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে রাখতে কঠোর নজরদারির আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষার্থীদের।

শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ডুমুরিয়ার মিকশিমিল রুদাঘরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত নবম শ্রেণির অভিভাবক সমাবেশে শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান মোবাইল আসক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে তাদের মেধা ও মনন ধ্বংসের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে আধুনিক প্রযুক্তি বিশেষ করে স্মার্টফোন, যা রোধ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই সমাবেশে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে মূলত শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার এবং তাদের বিপথগামিতা রোধ করার একটি যৌথ রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করা হয়। কী কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ছে এবং এর পেছনে আধুনিক প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার কতটা দায়ী, তা নিয়েই মূলত এই গুরুত্বপূর্ণ সভার সূত্রপাত ঘটেছিল, যা স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

সমাবেশে উপস্থিত একাধিক অভিভাবক তাদের সন্তানদের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে উদ্বেগের কথা জানান এবং নিজেদের অসহায়ত্ব ও করণীয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। অভিভাবক আলী মুনসুর ও আংশ মণ্ডল তার নবম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলের মেধার অপচয় ও মোবাইল প্রীতির কথা উল্লেখ করে বলেন যে পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো হওয়া সত্ত্বেও ডিভাইস প্রীতির কারণে তার সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনুরূপভাবে পড়ালেখার অগ্রগতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানান যে কেবল বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং ঘরে ফিরে সন্তানরা কী করছে এবং ডিজিটাল স্ক্রিনের পেছনে কত সময় নষ্ট করছে তার নিয়মিত খোঁজ নেওয়া প্রতিটি অভিভাবকের নৈতিক দায়িত্ব। বক্তারা এ সময় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে বর্তমান যুগে অভিভাবকরা অনেক সময় নিজেদের ব্যস্ততা দেখাতে গিয়ে কোমলমতি শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছেন সর্বনাশা ডিভাইস, যার ফলে কাঙ্ক্ষিত পড়াশোনা থেকে শিক্ষার্থীরা স্থায়ীভাবে দূরে সরে যাচ্ছে এবং তাদের সামাজিক আচরণেও নেতিবাচক পরিবর্তন আসছে। কেবল শাসন নয়, বরং পারিবারিক অনুশাসন ও মেন্টরিংয়ের অভাবই যে আজকের এই তরুণ সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তার একটি নিখুঁত চিত্র উঠে আসে এসব অভিভাবকের বক্তব্যে।

এই সার্বিক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত মোঃ জামাল, শ্রেণিশিক্ষক প্রভাস সাহা ও সহকারী শিক্ষক সুলতানা শিক্ষকদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। মোঃ রাজ্জাক সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে শিক্ষক প্রতিনিধিরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে কেবলমাত্র বিদ্যালয়ের ৪২ মিনিটের ক্লাসরুম শিক্ষায় কখনোই একটি শিশুর নৈতিক ও একাডেমিক পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব নয়, যদি না পরিবার থেকে তাকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। শিক্ষকরা অভিভাবকদের উদ্দেশে আহ্বান জানান যাতে অপ্রয়োজনে কোনো শিক্ষার্থীকে কোনো ধরনের স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া না হয় এবং তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হচ্ছে কি না সে বিষয়েও যেন কড়া নজরদারি বজায় থাকে।  এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে এই সভায় শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ডুমুরিয়ার এই বিদ্যালয়কেন্দ্রিক অভিভাবক সমাবেশটি মূলত বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রতিটি পরিবারে চলমান একটি নীরব সংকটেরই প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ, যা কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চিত্র নয় বরং গোটা জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থারই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তির কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির পাশাপাশি তাদের সৃজনশীলতা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য এই ধরনের সামাজিক আন্দোলন ও সচেতনতামূলক সভার কোনো বিকল্প নেই। যদি সময়মতো অভিভাবকরা সচেতন না হন এবং শিক্ষক সমাজের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যৌথভাবে এই ডিজিটাল আসক্তির লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে তা কেবল ব্যক্তিগত নয় বরং সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ মানবসম্পদকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেবে। এই ধরনের উদ্যোগ তাই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি প্রজন্মকে প্রযুক্তির অপব্যবহারের কবল থেকে রক্ষা করা এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি জাতীয় প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top