আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘সোর্স’ পরিচয়ের আড়ালে রাজধানীর বনানীতে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর অপরাধ সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে পরিচিত মো. শহীদ ওরফে ‘ফর্মা শহীদ’। বছরের পর বছর ধরে গুলশান-বনানী এলাকার মাদক ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকলেও রহস্যজনক কারণে সে এখনও অধরা। একসময় গুলশান-বনানী থানা পুলিশের ঘনিষ্ঠ সোর্স হিসেবে পরিচিত শহীদ এখন নিজেকে র্যাবের সোর্স হিসেবে পরিচয় দিয়ে বেড়ায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে এই সখ্যতাকে ঢাল বানিয়ে সে বনানীর গোডাউন বস্তি ও আশেপাশের এলাকায় মাদক, জুয়া এবং চাঁদাবাজির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় থাকলেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফর্মা শহীদের অপরাধ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কেউ সামান্যতম প্রতিবাদের আওয়াজ তুললেই তার ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। শহীদ তার ‘সোর্স’ কার্ড ব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ভুল তথ্য দেয়। নিরীহ মানুষকে মাদক ব্যবসায়ী সাজিয়ে বা তাদের কাছে মাদক রেখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া শহীদের নিয়মিত কৌশল। ফলে বস্তির সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার সাহস পায় না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত চতুরতার সাথে খোলস বদলায় শহীদ। গত ৫ই আগস্টের আগে সে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১৯নং ওয়ার্ড যুবলীগের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর রাতারাতি রঙ বদলে সে এখন স্থানীয় বিএনপি নেতা বনে গেছে। বর্তমানে কয়েকজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার ‘ছায়া’ ও দলীয় নাম ভাঙিয়ে সে এলাকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।
ফর্মা শহীদ কৌশলগত কারণে নিজে বনানীর গোডাউন বস্তিতে বসবাস করলেও, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির অবৈধ টাকায় টঙ্গীতে গড়ে তুলেছে বহুতল বিলাসবহুল ভবন। এ ছাড়া রাজধানী ও ঢাকার আশেপাশে তার কোটি কোটি টাকার বেনামী সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শহীদের আয়ের উৎসে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। বর্তমানে গোডাউন বস্তির অবৈধ গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সংযোগের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। এখান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সে। পাশাপাশি বনানী এলাকার ফুটপাত কেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বড় একটি অংশ যায় তার পকেটে। এমনকি বস্তির অত্যন্ত দরিদ্র ও নিরীহ মানুষদের কাছ থেকেও জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে জানা যায়, ফর্মা শহীদ বর্তমানে অত্যন্ত বেপরোয়া। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধির ওপর নজর রাখতে সে তার বস্তির ঘরের চারপাশে ও গলির মুখে অত্যাধুনিক সিসি (CC) ক্যামেরা স্থাপন করেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো গাড়ি বা সদস্য বস্তির দিকে আসছে কি না, তা সে ঘরে বসেই মনিটর করে। তার এই ঘরেই প্রতি রাতে বসে লাখ লাখ টাকার অবৈধ জুয়ার আসর। স্থানীয়দের দাবি, শহীদের কাছে একাধিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, যা সে মাঝেমধ্যেই এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও মানুষকে হুমকি দিতে প্রদর্শন করে।
এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “শহীদের লাইফস্টাইল দেখলে বোঝার উপায় নেই সে বস্তিতে থাকে। সে পুলিশ-র্যাবের নাম ভাঙিয়ে চলে, তাই কেউ তার বিরুদ্ধে থানায় যাওয়ার সাহস পায় না। আমরা এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চাই।”
এ বিষয়ে বনানী থানা পুলিশের একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স পরিচয়ে কেউ অপরাধ করার সুযোগ নেই। ফর্মা শহীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং মাদক-চাঁদাবাজির প্রমাণ পেলে দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধী যেই হোক, ছাড় দেওয়া হবে না।”




