কোথাও প্রবেশপথে বাঁধা হচ্ছে গরু, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। ভবনের সিঁড়ি ও গ্যালারিতে পড়ে রয়েছে বিড়ি-সিগারেটের অবশিষ্টাংশ। ভাঙা জানালা দিয়ে দেখা যায়, ভেতরে ধুলাবালি আর মাকড়সার জালে ঢাকা কম্পিউটার ও বিভিন্ন সরঞ্জাম। অথচ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীদের তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষায় এগিয়ে নিতে প্রায় ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল আইসিটি সেন্টারটি।
এ চিত্র কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় নির্মিত আইসিটি সেন্টারের। ২০২১ সালে উদ্বোধনের পরও কেন্দ্রটি কার্যকরভাবে চালু না হওয়ায় সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাটি পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। ফলে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ইন্টারনেট ব্যবহার ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীরা।
একসময় নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত দাসিয়ারছড়ার মানুষের কাছে আইসিটি সেন্টারটি ছিল নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল, এখানে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যবহার, অনলাইন আবেদন ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা পাওয়া যাবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের এসব কাজের জন্য দূরবর্তী এলাকায় যেতে হবে না। তবে উদ্বোধনের পর সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটির বিভিন্ন অংশে অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। চারপাশে জন্মেছে আগাছা। প্রবেশপথে বাঁধা হচ্ছে গরু। সিঁড়ি ও গ্যালারিতে পড়ে রয়েছে বিড়ি-সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ও প্যাকেট। ভবনের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধরনের বোতল ও ময়লা-আবর্জনা।
ভবনটি তালাবদ্ধ থাকলেও ভাঙা জানালা দিয়ে ভেতরের অবস্থা দেখা যায়। সেখানে ধুলাবালি ও মাকড়সার জালে ঢাকা অবস্থায় পড়ে রয়েছে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল মিয়াসহ কয়েকজনের অভিযোগ, উদ্বোধনের সময় কেন্দ্রটি চালু করে স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটি চালুর কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ইন্টারনেট সংযোগ, প্রয়োজনীয় জনবল ও অন্যান্য জটিলতার কারণে কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে। সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাটি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকলেও যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁদের।
দাসিয়ারছড়া মহাবিদ্যালয়ের আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক জয়ন্ত চন্দ্র সরকার বলেন, “ছিটমহলের শিক্ষার্থী ও তরুণদের কম্পিউটার শিক্ষা, ইন্টারনেট সুবিধা এবং ডিজিটাল সেবা দেওয়ার কথা ছিল এই সেন্টার থেকে। বাস্তবে তারা কোনো সুবিধাই পাননি। এটি সরকারি অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
একই মহাবিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহমুদ হাসান বলেন, “আইসিটি সেন্টারটি চালু থাকলে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, অনলাইন আবেদন, চাকরির প্রস্তুতি ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা সহজেই পাওয়া যেত। বছরের পর বছর ধরে ভবনটি বন্ধ থাকায় আমরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”
ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের নেতা মো. আলতাফ হোসেন বলেন, “আমাদের এলাকার শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের কম্পিউটার শিখতে ফুলবাড়ী ও কুড়িগ্রামে যেতে হয়। আইসিটি সেন্টারটি চালু হলে এই এলাকার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের বিরাট উপকার হতো।”
তবে কেন্দ্রটি চালু না হওয়ার পেছনে অবকাঠামোগত সমস্যা ও জনবলসংকটের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা।
উপজেলা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের আইসিটি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “দাসিয়ারছড়া আইসিটি সেন্টারটিতে অবকাঠামোগত কিছু দুর্বলতা রয়েছে। ভবনের ওপরের প্লাস্টিকের টিনসহ ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, লোকবলও নেই। কিছু কম্পিউটারে সমস্যা হয়েছে। এগুলো চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছি।”
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরা দ্রুত আইসিটি সেন্টারটি সংস্কার করে কার্যকরভাবে চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন এবং কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জাম পরীক্ষা করে মেরামতের মাধ্যমে কেন্দ্রটিতে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যে উদ্দেশ্যে প্রায় ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে আইসিটি সেন্টারটি নির্মাণ করা হয়েছিল, দ্রুত সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার তরুণ প্রজন্মের তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটবে




