খুলনায় স্বাস্থ্য কর্মসূচি পর্যালোচনা: জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকার শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ

খুলনা বিভাগে এইচপিভি টিকা এবং ইপিআই কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিভাগীয় কর্মশালা, যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিত করার নির্দ..

খুলনা হোটেল সিটি ইনে আয়োজিত দিনব্যাপী এই পর্যালোচনা কর্মশালায় খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই সভায় প্রধানত জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে কিশোরীদের জন্য নির্ধারিত এইচপিভি টিকার সফল বাস্তবায়ন এবং ইপিআই কর্মসূচির পরিধি বিস্তারের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১০ বছর বয়সী সকল কিশোরীকে এই টিকার আওতায় নিয়ে আসার যে জাতীয় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা কীভাবে খুলনা বিভাগের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় শতভাগ সফল করা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী দশ জেলার সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং শিক্ষা বিভাগের প্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ এলাকার কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরেন, যা মূলত স্বাস্থ্যসেবার তৃণমূল পর্যায়ের সক্ষমতা ও বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে।

কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ এবং ভুক্তভোগী ও লক্ষ্যভুক্ত জনগোষ্ঠীর সচেতনতার অভাবকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা জানিয়েছেন যে, এইচপিভি টিকা নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও তথ্যের ঘাটতি দূর করা না গেলে শতভাগ কাভারেজ অর্জন করা কঠিন। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র স্বাস্থ্য বিভাগের একক প্রচেষ্টায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল হওয়া সম্ভব নয়। তিনি মিডিয়ার ভূমিকা এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ইমামদের মাধ্যমে মসজিদের মুসল্লিদের অবহিত করলে টিকার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতার অভাব বা গাফিলতি জনস্বাস্থ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তাই প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীকে আরও বেশি জবাবদিহিতার আওতায় আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কর্মশালায় উপস্থিত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং ইউনিসেফের প্রতিনিধিরা এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচিকে কেবল একটি স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় দায়বদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমের মতোই এইচপিভি টিকাদানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং এ ব্যাপারে কোনো ধরনের শৈথিল্য প্রদর্শনের সুযোগ নেই। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. শেখ মো: মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় প্রশাসনিক ও কারিগরি সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইউনিসেফের হেলথ ম্যানেজার ডা. রিয়াদ মাহমুদসহ অন্যান্য অতিথিরা প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনার তাগিদ দিয়েছেন, যাতে কোনো কিশোরীই টিকার আওতার বাইরে না থাকে। সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের মধ্যে এই সমন্বয় বজায় থাকলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

পরিশেষে, খুলনা বিভাগে এই কর্মশালার মাধ্যমে যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার এই আধুনিকায়ন এবং টিকার ব্যাপক প্রচারণার ফলে কিশোরীদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, যা একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনের পথে বড় ধাপ। তবে এই কর্মশালার সাফল্য নির্ভর করছে মাঠ পর্যায়ে কতটুকু কার্যকরভাবে এবং স্বচ্ছতার সাথে টিকা প্রদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর। স্বাস্থ্য বিভাগের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের ইপিআই সুপার পর্যন্ত প্রত্যেকের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে দেশের স্বাস্থ্য খাতের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top