কয়রায় ইকোট্যুরিজমের নতুন দিগন্ত: টেকসই পর্যটনে সুন্দরবন সুরক্ষা ও উপকূলের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা খুলনার কয়রা উপজেলাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধ ইতিহাস। কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর শান্ত জলরাশি, ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভ বন, বিরল বন্যপ্রাণী, আদিবাসী মুন্ডা সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি এবং ৪০০ বছরের প্রাচীন ইতিহাস—সব মিলিয়ে কয়রা এক অনন্য সম্ভাবনাময় পর্যটন জনপদ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে কয়রা হতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ‘ইকোট্যুরিজম’ গন্তব্য, যা একদিকে স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ ঘটাবে এবং অন্যদিকে সুন্দরবনের ওপর বনাঞ্চলের মানুষের নির্ভরতা কমিয়ে বন সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

​এক সফরে নদী, প্রকৃতি ও ৪০০ বছরের প্রাচীন ইতিহাস

খুলনা জেলা শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কয়রার ভৌগোলিক অবস্থান একে অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের চেয়ে আলাদা করেছে। কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক মসজিদকুঁড় মসজিদ, বুড়া খাঁ ও ফতে খাঁর বসতভিটার অবশেষ, চাল ধোয়ার দীঘি এবং হাতি বাঁধার দীঘি ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের মূল আকর্ষণ। এছাড়া কয়রার কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন থেকে অনুমতিপত্র (পাস) নিয়ে নদীপথে সহজেই পৌঁছানো যায় সুন্দরবনের গভীরের শেখেরটেক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র (যেখানে রয়েছে প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন মন্দির), কালাবগী, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর ও বিখ্যাত শুঁটকি পল্লীতে। কয়রার ৪ নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট, কাটকাটা ও গোবরা ম্যানগ্রোভ বনকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় স্পট।

​উন্নয়নকাজের ধীরগতি ও স্থানীয়দের প্রতীক্ষা

কয়রা সদরের ৬ নম্বর কয়রা গ্রামে শাকবাড়িয়া নদীর তীরে ‘সুন্দরবন পর্যটন কেন্দ্র (কেওড়াকাটা)’ নির্মাণাধীন রয়েছে। স্থানীয় অধিবাসী ও পর্যটকদের জন্য এই কেন্দ্রটি বড় আশার আলো হলেও কাজের ধীরগতির কারণে সম্ভাবনাটি এখনো পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নেয়নি। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)’-এর প্রতিষ্ঠাতা আশিকুজ্জামান দ্রুত কেওড়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রের কাজ শেষ করে এটি চালুর জোর দাবি জানিয়েছেন।

​বিকল্প কর্মসংস্থান ও সুন্দরবন সুরক্ষা

সুন্দরবনের বাওয়ালি, মৌয়াল ও জেলেদের জীবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বনের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। কয়রায় টেকসই ইকোট্যুরিজম বিকশিত হলে পরিবহন, আবাসন, রেস্তোরাঁ, হস্তশিল্প, ট্যুর গাইড এবং স্থানীয় খাদ্যপণ্যের ব্যবসার মাধ্যমে নতুন নতুন বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ ওলিউল্লাহ জানান, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে আবাসন, আধুনিক স্যানিটেশন ও পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে কয়রা ইকোট্যুরিজমের জন্য আদর্শ স্থানে পরিণত হবে।

​উন্নয়নের জন্য যা প্রয়োজন

কয়রাকে একটি সফল পর্যটন হাব বা সার্কিটে পরিণত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন জরুরি:

  • ​নিরাপদ ও মানসম্মত সড়ক ও নদীপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা।
  • ​পরিবেশবান্ধব নৌযানের প্রচলন, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড।
  • ​আদিবাসী মুন্ডা জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা।
  • ​সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে ‘গ্রিন ট্যুরিজম’ বা টেকসই নীতি অনুসরণ করা।

​নদী, বন এবং ইতিহাসের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কয়রার বিপুল পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দ্রুত পরিকল্পিত পদক্ষেপ ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top