খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও সিমেন্ট বোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত ও অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন, উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে।
খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ডুমুরিয়া উপজেলার আঠারোমাইল ডাঙ্গীরপার এলাকায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। খুলনা থেকে সাতক্ষীরাগামী যাত্রীবাহী বাস (সাতক্ষীরা জ-১১-০০৯৬) এবং বিপরীত দিক থেকে আসা ক্রাউন সিমেন্ট বোঝাই ট্রাকের (নারায়ণগঞ্জ উ-১১-০০২৬) মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে এ প্রাণ হানির ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, বেপরোয়া গতিতে চলা বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের খাদে পড়ে যায় এবং ট্রাকটি দুমড়েমুচড়ে রাস্তার ওপর আটকে যায়। এ ঘটনায় ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল মিলিয়ে এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস। ঘটনার পরপরই খর্ণিয়া হাইওয়ে থানা পুলিশ ও ডুমুরিয়া ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট উদ্ধার অভিযানে নামে, যা বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত চলমান ছিল। বাসের নিচে আরও মরদেহ থাকার আশঙ্কায় উদ্ধারকারীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজ পরিচালনা করছেন।
দুর্ঘটনার পরপরই আহত যাত্রীদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে এলাকাটি। স্থানীয় উদ্ধারকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস চালকদের অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা এবং অতিরিক্ত গতির কারণেই এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আহত যাত্রীদের ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দ্রুত স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় ট্রাকচালকসহ অন্তত ৪০ থেকে ৪২ জন যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, অধিকাংশ সময় চালকরা ট্রাফিক আইন না মেনে এবং প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে গাড়ি চালানোর ফলে যাত্রীরা সবসময়ই চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন জিন্নাত আলীসহ অন্যান্যদের স্বজনরা জানান, চালকের খামখেয়ালিপনা ও দ্রুতগতির কারণে মুহূর্তের মধ্যে একটি আনন্দদায়ক যাত্রা শোকের ছায়ায় পরিণত হয়েছে। আহতদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, কারণ অধিকাংশ আহতের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। খর্ণিয়া হাইওয়ে থানা পুলিশের ভাষ্যমতে, প্রাথমিক তদন্তে বাসের অতিরিক্ত গতিকেই দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাস ও ট্রাকের মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দায়িত্বশীল বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাসটি উদ্ধারের কাজ চলছে। উদ্ধারকারী দলের প্রধান জানান, দুর্ঘটনা কবলিত বাসের ভেতরে বা নিচে আরও কেউ আটকে আছেন কি না তা নিশ্চিত করতে তারা কাজ করছেন। হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়মিত টহল বাড়ানো হলেও চালকদের অসচেতনতা ও নিয়ম ভাঙার প্রবণতা রোধ করা যাচ্ছে না। দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে যান চলাচল সাময়িক ব্যাহত হয়, তবে পুলিশি তৎপরতায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ।
এই দুর্ঘটনাটি মূলত মহাসড়কে বিদ্যমান নিরাপত্তার অভাব এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের এক ভয়াবহ প্রতিফলন। জনবহুল এই রুটে নিয়মিত বিরতিতে এ ধরনের দুর্ঘটনা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং চালকদের কঠোর নজরদারির আওতায় না আনলে এই মৃত্যুমিছিল থামানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা না ফিরলে অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। প্রশাসনিক নজরদারি কেবল দুর্ঘটনার পরেই সীমাবদ্ধ না রেখে, নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে চালকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সড়কে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পরিবহন মালিক ও সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে থাকবে।




