দশমিনার প্রধান লঞ্চঘাটের জেটি নদীতে ; কাদা-পানি পেরিয়ে লঞ্চে ওঠানামায় যাত্রীদের ভোগান্তি

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হাজীরহাট লঞ্চঘাটের বিআইডব্লিউটিএ টার্মিনালের সংযোগ জেটি দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে নদীতে ডুবে রয়েছে। ফলে টার্মিনালে লঞ্চ ভেড়ানোর সুযোগ না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কাদা-পানি পেরিয়ে লঞ্চে ওঠানামা করতে হচ্ছে সহস্রাধিক যাত্রীকে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাজীরহাট লঞ্চঘাটের টার্মিনালের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী জেটিটির পুরো অংশই ভেঙে নদীতে ডুবে রয়েছে। এতে টার্মিনালটি কার্যত জেটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ঘাটের দক্ষিণ পাশে নদীর তীরে একটি অনিরাপদ স্থানে লঞ্চ ভেড়ানো হচ্ছে।
এ অবস্থায় কাদা ও কোমরসমান পানি পেরিয়ে যাত্রীদের লঞ্চে ওঠানামা করতে হচ্ছে। জোয়ারের সময় নদীর পানি বাড়লে লঞ্চগুলো কোনোভাবে তীরের কাছাকাছি ভেড়ানো সম্ভব হলেও ভাটার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পানি নেমে গেলে তীর থেকে লঞ্চের দূরত্ব বেড়ে যায়। ফলে নারী, শিশু, অসুস্থ রোগী ও বয়স্কদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে উঠতে হয়।
হাতে ব্যাগ ও মালামাল থাকা সত্ত্বেও অনেক যাত্রীকে জুতা খুলে হাতে নিতে দেখা যায়। কেউ কেউ কাদা-পানি এড়াতে পরনের কাপড় ওপরের দিকে তুলে লঞ্চে ওঠানামা করছেন। এতে নারী-পুরুষ উভয়কেই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
জানা যায়, হাজীরহাট লঞ্চঘাটটি দশমিনা উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌযোগাযোগ কেন্দ্র। এ ঘাট দিয়ে প্রতিদিন ঢাকা ছাড়াও বরিশাল, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ভোলা, চরফ্যাশন, মনপুরা এবং উপজেলার নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের সহস্রাধিক মানুষ যাতায়াত করেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের পণ্য ও কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্যও এ ঘাটের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
ঢাকাগামী যাত্রী জাকির হোসেন হাওলাদার বলেন, “জেটিটি বিচ্ছিন্ন হওয়ায় লঞ্চে ওঠানামা করতে খুবই কষ্ট হয়। বিশেষ করে রাতে ও ভোররাতে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। দ্রুত নতুন জেটি নির্মাণ করে নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।”
চাঁদপুরগামী যাত্রী সালমা জাহান বলেন, “শিশু নিয়ে লঞ্চে ওঠানামা করতে খুব সমস্যা হয়। অনেক সময় পা পিছলে নিচে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।”
ভোলার চরফ্যাশনগামী যাত্রী আনোয়ার সিকদার বলেন, “কাঠের সরু সিঁড়ি দিয়ে লঞ্চে উঠতে গিয়ে অনেক সময় যাত্রীদের ভারসাম্য হারাতে দেখা যায়। সঙ্গে মালপত্র থাকলে সমস্যাটি আরও বেড়ে যায়। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত জেটি নির্মাণ করা দরকার।”
এমভি পূবালী-৬ লঞ্চের চালক মনির হোসেন বলেন, “টার্মিনাল ছাড়া অন্য জায়গায় লঞ্চে যাত্রী ওঠানামার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। নিরাপদ নৌযাত্রার স্বার্থে দ্রুতই জেটিটি নির্মাণ করা জরুরি।”
ঘাট ইজারাদার সাওফাত হোসেন বলেন, “জেটিটি ভেঙে ডুবে যাওয়ায় প্রতিদিন যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ঘাটটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে সবসময় যাত্রী ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের চাপ থাকে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
বিআইডব্লিউটিএ পটুয়াখালীর সহকারী পরিচালক মো. জাকী শাহরিয়ার মুঠোফোনে বলেন, “এলাকাটি নদীভাঙনপ্রবণ এবং সম্প্রতি সেখানে নদীভাঙনও দেখা দিয়েছে। এ কারণে নিচের মাটি সরে গেছে সম্ভবত। তাছাড়া সেখানে তীর সুরক্ষার ব্যবস্থাও নেই। এ কারণে জেটিটি দুর্বল হয়ে ভেঙে গেছে। বিষয়টি প্রকৌশল শাখায় জানিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “জেটির কাজ খুব স্বল্প সময়ে করা সম্ভব নয়। টেন্ডারিংয়ের বিষয় থাকে। যেহেতু টেকসই রিভার ব্যাংক প্রটেকশন নেই, সেক্ষেত্রে আমরা জেটি করলেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কয়েক দিন পর আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেহেতু সময়সাপেক্ষ, তাই পন্টুনটি আপাতত দক্ষিণ পাশে ফাঁকা জায়গায় স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।”
দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, “আমি বিষয়টি সরেজমিনে গিয়ে দেখেছি। দশমিনা উপজেলার একমাত্র বাণিজ্যিক কেন্দ্র হাজীরহাট পন্টুন। এখানে ঢাকা, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলা শহর থেকে মালামাল আসে। সেহেতু এটি সংস্কার করা জরুরি। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, দশমিনার হাজীরহাট, বাঁশবাড়িয়া ও আউলিয়াপুর পন্টুন টেন্ডারের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার করা হবে।”

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top