কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই মুখে মাস্ক পরে সকাল ৮টায় ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে পরিচালিত এই ঝটিকা পরিদর্শনে হাসপাতালের নানা অব্যবস্থাপনা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির চিত্র উঠে আসে। দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মন্ত্রী।
অনুপস্থিত চিকিৎসক ও কর্মকর্তা:
পরিদর্শনকালে হাসপাতালটির উপস্থিতি খাতা যাচাই করে কর্মস্থলে পাঁচজন চিকিৎসকের অনুপস্থিতি দেখতে পান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাহাত চৌধুরীকেও কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। তাঁকেসহ মোট চারজনকে সরকারি হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত দেখানো হয়। নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার এই অভিযোগের বিষয়েও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনা:
এদিন মন্ত্রীর পরিদর্শনে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, বহির্বিভাগ, রান্নাঘর, শৌচাগার ও আশপাশের পরিবেশের বেহাল দশা উঠে আসে। নিচতলার রান্নাঘরের পাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখে তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। এছাড়া শৌচাগার ও গোসলখানার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। দীর্ঘ আট মাসেও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি না হওয়াকে দায়িত্বে অবহেলা হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে সরকারি বরাদ্দের টিকা ও ভ্যাকসিন যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করে নিচে ফেলে রাখা অবস্থায় দেখতে পেয়ে মন্ত্রী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সতর্ক করেন এবং সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
রোগীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আশ্বাস:
শিশু ওয়ার্ড পরিদর্শনকালে ভর্তি শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় শয্যা ও রেক্সিন চাদরের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় একটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করানোর দুর্ভোগের বিষয়েও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী সেবা নিতে আসেন। তবে শয্যাসংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং স্থানীয়ভাবে খাবার সরবরাহ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। একসময়ের দেশের শীর্ষস্থানীয় এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির সেবার মান বর্তমানে প্রশ্নবিদ্ধ।
স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার ও সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, আকস্মিক পরিদর্শনে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়া গেছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিগত সরকারের আমলের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের কথা উল্লেখ করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
এ সময় সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি জানান,
উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে ১৫১-তে উন্নীত করা হবে।
কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস সুবিধা চালু এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ করা হবে।
ইউনিয়ন সদর এলাকায় বহুতল পরিবার হাসপাতাল এবং পুরোনো তিনটি ওয়ার্ডেও পরিবার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করা হবে।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফুলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাধনা ত্রিপুরা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. সাদ মাহমুদ জয়সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।



