স্মার্টফোনের অদৃশ্য বিষ: গিলে খাচ্ছে তরুণদের ভবিষৎ

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে গতিশীল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এখন সমাজজীবনে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। প্রযুক্তিপণ্য, বিশেষ করে আধুনিক স্মার্টফোন আজ তরুণ সমাজের কাছে এক অদৃশ্য মারাত্মক ফাঁদে পরিণত হয়েছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে উদীয়মান তরুণদের একটি বড় অংশ দিন-রাত স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ছে। তবে এ আসক্তি কেবল সামাজিক যোগাযোগের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; স্মার্টফোনের আড়ালে তরুণদের একটি বিশাল অংশ দ্রুত জড়িয়ে পড়ছে অনলাইন ক্যাসিনো ও জুয়ার মতো ধ্বংসাত্মক সামাজিক অপরাধে।

​দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চিকিৎসকেরা তরুণদের মধ্যে চোখের নানা জটিলতা, ঘাড় ও পিঠে ব্যথা (টেক্সট নেক সিনড্রোম) এবং স্থূলতা দ্রুত বৃদ্ধির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। রাত জেগে স্ক্রিন স্ক্রোল করার অভ্যাসে তৈরি হচ্ছে তীব্র অনিদ্রা। অন্যদিকে মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৃত্রিম দুনিয়ায় আটকে পড়ে তরুণদের মাঝে চরম হতাশা, দুশ্চিন্তা ও একাকীত্ব দানা বাঁধছে, যা তাদের বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্কগুলো থেকে প্রতিনিয়ত দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

​অনবরত নোটিফিকেশন চেক করা এবং রিলস বা শর্টস জাতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও দেখার প্রবণতায় নতুন প্রজন্মের মনোযোগের সময়সীমা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। কোনো বিষয়ে গভীরভাবে ভাবা কিংবা দীর্ঘসময় মনোযোগ দিয়ে বই পড়ার সক্ষমতা তারা হারাচ্ছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল ও মেধার বিকাশে। একই সঙ্গে রেডিমেড তথ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তাদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

​স্মার্টফোন আসক্তির সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিকটি হলো ডিজিটাল জুয়ার নিরঙ্কুশ বিস্তার। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর জুয়ার রূপ পরিবর্তিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সাইবার জগতে। রাশিয়া, সাইপ্রাস, মালয়েশিয়া ও প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশ থেকে পরিচালিত বেশ কিছু অনলাইন অ্যাপ খুব সহজেই শিক্ষার্থী ও তরুণদের টার্গেট করছে। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সহজে অর্থ লেনদেনের সুযোগ থাকায় দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভনে লাখ লাখ শিক্ষার্থী এতে প্রলুব্ধ হচ্ছে।

​সামান্য কৌতূহল থেকে শুরু হলেও পরবর্তীতে তা তীব্র আসক্তিতে রূপ নিচ্ছে। ফলে টিফিনের টাকা, টিউশন ফি এমনকি পরিবারের জমানো অর্থ খুইয়ে বহু শিক্ষার্থী আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা চুরি, ছিনতাই ও ঋণের চক্রেও জড়িয়ে পড়ছে। মানসিক চাপ ও সর্বস্ব হারানোর হতাশায় অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, মনোযোগের তীব্র অভাব, শারীরিক আলস্য ও মানসিক অবক্ষয়ের কারণে দেশের মূল কর্মক্ষম জনশক্তির কার্যকারিতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উৎপাদিকা শক্তিতে চরম আঘাত হানবে। পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগত ও জুয়ার প্রভাবে তৈরি হচ্ছে একটি অনুভূতিহীন, বিচ্ছিন্ন ও অপরাধপ্রবণ প্রজন্ম।

​তরুণ প্রজন্মকে এই মানসিক পঙ্গুত্ব ও দেউলিয়াত্ব থেকে বাঁচাতে এখনই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সুশীল সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য অবৈধ অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম ও অ্যাপগুলো অনতিবিলম্বে ব্লক করা এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমগুলোতে কঠোর নজরদারি চালানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারগুলোকে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, তাদের ডিভাইস ব্যবহারের ওপর নজর রাখা এবং ‘ডিজিটাল-মুক্ত সময়’ চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া মাঠে খেলাধুলা, বই পড়া, অপ্রয়োজনে বিদ্যালয়ে মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা এবং সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সমন্বিত প্রতিরোধ গড়াই এখন সময়ের দাবি।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top