ময়মনসিংহের ভালুকায় দলিল লেখক আবু জাকারিয়া (মিন্টু) হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১০ জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজনকে ৩০ হাজার টাকা এবং যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাঁদের আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
আজ বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে ময়মনসিংহের বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফারহানা ফেরদৌস এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, মো. ফরিদ খলিফা (৪৮) ও পলাতক মো. মাসুদ মিয়া (৪১)। তাঁদের মধ্যে ফরিদ খলিফা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি মামলার ৫ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি। আর এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামি মাসুদ মিয়া রায় ঘোষণার সময় পলাতক ছিলেন।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, আবদুল মতিন (৪৫), তাঁর বাবা আব্দুস ছাত্তার ওরফে ছন্দেন আলী (৬৮), মো. মোশারফ হোসেন (৫৮), মো. মোফাজ্জল হোসেন (৫৮), তাঁর ভাই মো. তোফাজ্জল হোসেন (৪৮), মো. নজরুল মিয়া (৪৩), মো. মোকলেছুর রহমান (৫৩), মো. শাহজাহান আকন্দ (৪৮), তাঁর ভাই মো. আতিকুল (৩৯) এবং পলাতক মো. সিদ্দিক মিয়া (৬৩)। আদালত তাঁদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে প্রত্যেককে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
আদালতের নথি সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে জমিজমা–সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের জেরে ভালুকা উপজেলার উথুরা ইউনিয়নের নারাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা ও ভালুকা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আবু জাকারিয়া (মিন্টু) নিজ বাড়ির পাশে পৈত্রিক সম্পত্তি দেখভাল করতে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাঁকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে তাঁকে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী লতিফা খাতুন ২০১৩ সালের ১৫ আগস্ট ভালুকা মডেল থানায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর ১২ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
মামলার বিচার চলাকালে আদালত ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। বিচারিক কার্যক্রম শেষে আজ রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ের সময় ১২ আসামির মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন ও যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত একজন পলাতক ছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন বিশেষ দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আকরাম হোসেন। বাদীপক্ষে শুরু থেকে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী রাশেদা তাহমিনা। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী এ এইচ এম খালেকুজ্জামান। তবে রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
রায়ের পর পিপি মো. আকরাম হোসেন বলেন, জমি–সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দলিল লেখককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আদালত ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণেও বলা হয়েছে, সাক্ষ্যপ্রমাণে হত্যাকাণ্ড সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট এবং দ্রুত রায় কার্যকরের আশা করছে।
রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহতের স্ত্রী লতিফা খাতুন ও ছেলে জাহিদ হাসান তালুকদার।
রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে জাহিদ হাসান তালুকদার বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে আমার বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। দীর্ঘ ১৩ বছর পর আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা দ্রুত কার্যকর হোক, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
অন্যদিকে রায়ের পর আসামিপক্ষের স্বজনেরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আতিকুলের বড় ভাই সিরাজুল ইসলাম বলেন, জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটেছিল। এ রায়ে তাঁরা সন্তুষ্ট নন এবং উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
ময়মনসিংহ আদালতের পরিদর্শক পি এস এম মোস্তাছিনুর রহমান বলেন, ‘প্রায় ১৩ বছর পর বহুল আলোচিত এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ের সময় ১০ আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’




