ঘেরের অব্যবস্থাপনা ও স্থায়ী সংস্কারের অভাবে ডুমুরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রংপুর-বটবেড়া সড়কটি ভেঙে বিলীন হওয়ার পথে, যার ফলে হাজারো মানুষের যাতায়াত চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ রংপুর-বটবেড়া সড়কটি ভেঙে মাছের ঘেরের সঙ্গে প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা স্থানীয় জনজীবনে মারাত্মক সংকট তৈরি করেছে। বিগত কিছুদিন ধরে চলা বর্ষার ভারী বৃষ্টিপাত এবং অপরিকল্পিতভাবে ঘের পরিচালনার কারণে এই সড়কের বিভিন্ন অংশে ভয়াবহ ভাঙন ও গভীর খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে যান চলাচল কার্যত স্থবির এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন এই ভাঙা ও খানাখন্দে ভরা রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে সাইকেল, ভ্যান, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলের মতো ছোট ও মাঝারি যানবাহনগুলোর দুর্ঘটনার শিকার হওয়া নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এই ধসে যাওয়া সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে একটি মালবোঝাই গরুর গাড়ি উল্টে গিয়ে প্রায় দুই লক্ষ টাকা মূল্যের একটি গরুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয় বরং এই বেহাল অবকাঠামোর বাস্তব ও ভয়াবহ চিত্রকে উন্মোচন করেছে। জরুরি এই পথটিতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী বা কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ পথচারী ও চালকদের জীবন ও সম্পদ প্রতি মুহূর্তেই এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। দ্রুত এই পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন না ঘটলে সড়কটি সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়ে পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ অনুযায়ী, সড়কের দুই পার্শ্বে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছের ঘের তৈরি করার কারণে এবং ঘেরের পাড় রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় জলমগ্নতার চাপে সড়কের মাটি অবিরত ক্ষয় হতে শুরু করেছে। এই অব্যাহত ক্ষয়ের ফলে রাস্তার নিচে বড় বড় গর্ত এবং সুড়ঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে সামান্য চাপ বা ভারী যানবাহনের চলাচলেও সড়কটি সরাসরি ঘেরের গভীর জলের দিকে ধসে পড়ছে। অথচ স্থানীয় ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর স্পষ্ট অভিযোগ যে, দীর্ঘদিন ধরে এই জনদুর্ভোগ অব্যাহত থাকলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল এই সংকট নিরসনে সম্পূর্ণ উদাসীন ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। নিরুপায় হয়ে সাধারণ পথচারীরা বাধ্য হয়ে নিজেদের উদ্যোগে রাস্তার পাশের জমে থাকা কচুরিপানা ও ঘাস তুলে ধসে যাওয়া অংশে ফেলে কোনোমতে চলাচল করার বিপজ্জনক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা প্রশাসনের দায়িত্বহীনতাকে আরও প্রকট করে তুলছে। বটবেড়া, কৃষ্ণনগর, মুজারঘুটা, বারানসি এবং সারাভিটাসহ পুরো বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের হাজারো মানুষ প্রতিদিন শিক্ষা, ব্যবসা, এবং চিকিৎসাজনিত কারণে এই একক সড়কের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও তারা প্রতিদিন চরম অবহেলা ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু এবং জরুরি অসুস্থ রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে চারচাকার কোনো অ্যাম্বুলেন্স বা যানবাহন এই ভাঙা পথে প্রবেশ করতে না পারায় রোগীদের জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে যাচ্ছে।
এই জনগুরুত্বপূর্ণ ও সংকটাপন্ন পরিস্থিতির বিপরীতে স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়া থেকে জানা যায় যে, সংকট সমাধানের প্রক্রিয়াটি কেবল দীর্ঘসূত্রিতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ১২নং রংপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ সমরেশ মন্ডল এই বেহাল দশার দায় স্বীকার করে দাবি করেছেন যে, সড়কটি দ্রুত সংস্কারের জন্য ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তরে একাধিকবার লিখিতভাবে অবগত করা হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অন্যদিকে, ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল হুদা জানিয়েছেন যে, রংপুর-বটবেড়া সড়কের পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদন চেয়ে প্রকল্প পাঠানো হয়েছে এবং অনুমোদন পাওয়া গেলে তবেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। প্রশাসনের এই গতানুগতিক ও শ্লথ গতিসম্পন্ন আশ্বাসের বিপরীতে এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো দীর্ঘমেয়াদী বা বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কিংবা সড়কটি সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হওয়ার আগেই এর ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে অবিলম্বে কার্যকর সংস্কার কাজ শুরু করতে হবে। স্থানীয় জনগণের এই জোরালো দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, কারণ একটি সড়কের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে একটি এলাকার সমগ্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনযাত্রা, যা কোনোভাবেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আবর্তে আটকে থাকতে পারে না।
পরিশেষে বলা যায়, রংপুর-বটবেড়া সড়কের এই করুণ ও বিপজ্জনক অবস্থা কেবল একটি স্থানীয় যোগাযোগ সমস্যা নয়, বরং এটি গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে তদারকির অভাব এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের একটি ধ্বংসাত্মক প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঘের মালিকদের খামখেয়ালীপনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রিতা ও উদাসীনতার সম্মিলিত ফল ভোগ করতে হচ্ছে বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে। সময়মতো এই সড়কটির সংস্কার ও স্থায়ী ভাঙন রোধ করা না হলে কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে না, বরং এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন, বিপণন এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তাই জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে এই সড়কটির টেকসই সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা এবং একই সাথে যত্রতত্র অপরিকল্পিত ঘের তৈরির প্রবণতা বন্ধে কঠোর আইনি নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা সময়ের সবচেয়ে জোরালো ও অবশ্যম্ভাবী দাবি।




