সিলেটের সুরমা নদীর দক্ষিণ তীরের সবুজ শ্যামল জনপদ গোলাপগঞ্জ। এই উপজেলার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক অপরুপ গ্রামের নাম গোয়াসপুর। পাহাড়সম উঁচু টিলা, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ আর সবুজের অনাবিল মেলবন্ধনে সাজানো এই গ্রাম যেন কোনো এক শিল্পীর তুলিতে আঁকা নিপুণ ক্যানভাস।
আপনি যদি নগরের কোলাহল ছেড়ে এক চিলতে শান্তির খোঁজে বের হন, তবে গোয়াসপুরের মেঠোপথ আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে।
সিলেটের পুরানপুল বা নয়াপুল থেকে জকিগঞ্জ রোড ধরে গোলাপগঞ্জের মাটির দোকান পয়েন্টেই গোয়াসপুরের মূল প্রবেশদ্বার। (চাইলে চন্দনভাগ লংলীপুল, তেরমাইল, তালগাছের তলের পুল কিংবা চৌঘরী বাজারের মুখ দিয়েও ঢোকা যায়)।
মাটির দোকান দিয়ে প্রবেশ করতেই ডানপাশে চোখে পড়বে দিগন্তজোড়া সবুজ ফসলের মাঠ। অনতিদূরে পরিপাটি বাড়িঘর। বামপাশের উঁচু জমিতে ঐতিহ্য বহন করছে পুরাতন ঘরবাড়ির আদল। একটু এগোলেই ঘন গাছগাছালি আর কোলাহলমুক্ত জনবসতিপূর্ণ ‘খলত’। এরপরই চোখে পড়বে কারুকাজমণ্ডিত জামে মসজিদ ও আধুনিক স্থাপত্যের প্রাইমারি স্কুল।
গ্রামের ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই পথটি আপনাকে নিয়ে যাবে একের পর এক নয়নাভিরাম স্থাপনার কাছে, সবুজে ঘেরা নয়াবাড়ি পার হয়ে টিলার ওপর চোখ রাখলেই দেখা মিলবে উঁচাবাড়ির। আরেকটু এগোলেই একখণ্ড সবুজ বাগানের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী সাঝির বাড়ি। এটি একসময় পাঞ্চায়িতী আমলের গ্রাম্য সহকারী পঞ্চায়েত প্রধান (মৃত) আব্দুল রশিদ লস্করের বাড়ি হিসেবে খ্যাত ছিল। সামনে এগোলেই দৃষ্টি কাড়বে নয়নাভিরাম লামারবাড়ি। বাড়ির সামনেই শান বাঁধানো শান্ত পুকুর। চতুর্দিকে সবুজ বেষ্টনী যেন গ্রামীণ রূপকথাকে জীবন্ত করে তোলে।
লামারবাড়ির পাশেই গ্রামীণ সৌন্দর্য বাড়িয়েছে সবুজ বাগানে সজ্জিত ‘টঙ্গী বাড়ি’। তার ঠিক উল্টোদিকে ছায়ানিবিড় ‘আকলের বাড়ি’ যার সামনের ঘন বন বাড়িদুটোকে এনে দিয়েছে এক অনন্য নান্দনিকতা। লামারবাড়ি থেকে একটু সামনে অগ্রসর হলেই চিরসবুজ পুরানবাড়ি, আর তার পাশে বনানীতে ঘেরা উত্র বাড়ি। টিলার পথ ধরে এগোলে টিলার ঠিক কোল ঘেঁষে দেখা মিলবে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা অনন্য ‘ভাঙাবাড়ি’। ভাঙাবাড়ির পরেই সবুজ-শ্যামল ছায়াঘেরা ঐতিহ্যবাহী লস্কর বাড়ি, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মনতর বাড়ি’ নামে পরিচিত। এর চারপাশের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ যেকোনো পথিকের মন জুড়িয়ে দেয়।
পেছন দিকের মেঠোপথ ধরে এগোলে আপনার সামনে ভেসে উঠবে এক অলৌকিক দৃশ্যপট, নয়নাভিরাম ঘন বনানীতে ঘেরা বলগের টিলা। এটি গ্রামের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। উঁচু টিলার ওপর দাঁড়িয়ে চারপাশের সবুজ রূপ অবলোকন করা এক স্বর্গীয় অনুভূতি। বলগের টিলার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। পথের একপাশে দোলে সবুজ ধানক্ষেত, আর অন্যপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ‘সূর্য টিলা’।
এছাড়াও গোয়াসপুরের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে আছে শান্ত ছায়ানিবিড় পশ্চিমবাড়ির বাদাম বাগান, শৈশবের রোমাঞ্চ ছড়ানো লাল টিল্লা, রোমাঞ্চকর চিটামঠকি টিলা, ঐতিহাসিক হানাবাড়ি ও শিক্ষার আলো ছড়ানো কুতুব আলী স্কুল।
ইটের দালান আর যান্ত্রিক জীবনের বাইরে প্রকৃতির এই অচেনা স্বর্গরাজ্যে পৌঁছানো বেশ সহজ। সিলেটের কদমতলী বাস টার্মিনাল বা কীন ব্রিজের মোড় থেকে সিএনজি/বাসযোগে চলে আসুন গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীতে। চৌমুহনী থেকে স্থানীয় সিএনজি অটোরিকশা বা রিকশা নিয়ে মাটির দোকান কিংবা চৌঘরী বাজার হয়ে সরাসরি ঢুকে পড়ুন গোয়াসপুর গ্রামে। রূপসী বাংলা দেখতে সুদূর দূরান্তে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, বাড়ির পাশেই প্রকৃতির অনন্য রূপ আর ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে যেকোনো ছুটির দিনে ঘুরে আসতে পারেন সিলেটের এই গোয়াসপুর গ্রাম থেকে।

